Broadcast India News.

Broadcast India News.

9th March, 2026

খুদিরাম বসু : বীর শহীদের অমর কাহিনী

খুদিরাম বসু : বীর শহীদের অমর কাহিনী

 

ক্ষুদিরাম বসু: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর বিপ্লবী

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনে অমর হয়ে থাকবে। ক্ষুদিরাম বসু সেই নামগুলির মধ্যে অন্যতম। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা এই কিশোর বিপ্লবী আজও স্বাধীনতার স্বপ্ন, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক।


শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন

ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম হয় ৩ ডিসেম্বর, ১৮৮৯ সালে, মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ত্রৈলক্যনাথ বসু ছিলেন তৎকালীন একজন দরিদ্র কিন্তু সৎ কর্মচারী, আর মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী ছিলেন ধর্মপ্রাণা ও সাহসী মহিলা। শৈশবেই বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে ক্ষুদিরাম বড় হন বোন অপরূপার কাছে।

ছোটবেলা থেকেই ক্ষুদিরাম ছিলেন একরোখা, সাহসী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। ব্রিটিশ শাসনের দমননীতি, গ্রামে পুলিশের অত্যাচার, এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের অনুপ্রেরণা তাঁর মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করে।


বিপ্লবী জীবনের সূচনা

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সারা বাংলায় তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখন ক্ষুদিরামের বয়স মাত্র ১৫, কিন্তু তিনি ইতিমধ্যেই বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
তিনি স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, ব্রিটিশ পণ্যের বয়কট, বিপ্লবী প্রচারপত্র বিতরণ এবং যুবকদের সংগঠিত করার কাজে যুক্ত হন।


মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র

১৯০৮ সালে যুগান্তরের নেতৃত্বে একটি পরিকল্পনা তৈরি হয় ব্রিটিশ বিচারক কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য। কিংসফোর্ড ছিলেন বিপ্লবীদের প্রতি নির্মম, এবং অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন।

ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকি এই দায়িত্ব পান।
১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাতে তারা মুজাফফরপুরে ইউরোপিয়ান ক্লাবের কাছে বোমা নিক্ষেপ করেন। দুর্ভাগ্যবশত, কিংসফোর্ড তখন গাড়িতে ছিলেন না; তাঁর বদলে স্ত্রী ও কন্যা উপস্থিত ছিলেন, যারা মারা যান। এই ঘটনা ব্রিটিশ প্রশাসনের চরম ক্ষোভের কারণ হয়।


গ্রেপ্তার ও বিচার

বোমা হামলার পর ক্ষুদিরাম পালানোর চেষ্টা করলেও ১ মে, ১৯০৮ তারিখে তিনি ধরা পড়েন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর পায়ে খালি ছিল, হাতে ছিল মাত্র একটি পিস্তল ও কয়েকটি গুলি।
তাঁর বয়স তখন ১৮ বছরও হয়নি, কিন্তু পুলিশ তাঁকে দমাতে পারেনি।

বিচারের সময় ক্ষুদিরাম আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর মুখে তখনও হাসি ছিল, যা আদালতের উপস্থিত সবার মনে গভীর দাগ কাটে।
১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।


শহীদ ক্ষুদিরাম

১১ আগস্ট, ১৯০৮ সালে মুজাফফরপুর জেলায় ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর হয়। মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি দৃঢ়চিত্তে হাসিমুখে এগিয়ে যান। গলায় ফাঁসির দড়ি পরার আগে তিনি বলেছিলেন,

"আমি দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছি, এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কিছু নেই।"

ক্ষুদিরামের মৃত্যু তখনকার তরুণ প্রজন্মকে বিপ্লবী সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর আত্মত্যাগে সমগ্র বাংলায় শোক ও ক্ষোভের ঢেউ ওঠে।


ক্ষুদিরামের উত্তরাধিকার

ক্ষুদিরাম বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অমর প্রতীক হয়ে রয়েছেন। তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগ একদিকে যেমন বিপ্লবী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল, তেমনই ভবিষ্যতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পথ দেখিয়েছে।
আজও তাঁর নামে শহর, রাস্তা, স্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে উঠেছে।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ক্ষুদিরামের স্মৃতি চিরন্তন। গান, কবিতা ও নাটকে তাঁর বীরত্বকে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে "একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি" গানটি ক্ষুদিরামের স্মৃতির সঙ্গে চিরকাল জড়িয়ে আছে।


আমাদের কাছে ক্ষুদিরামের শিক্ষা

ক্ষুদিরাম আমাদের শিখিয়েছেন—বয়স কখনও দেশের জন্য লড়াই করার পথে বাধা হতে পারে না। সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগই ইতিহাসে অমর করে রাখে একজন মানুষকে।
আজকের প্রজন্মের উচিত তাঁর দেশপ্রেমকে স্মরণ করে নিজেদের জীবনেও ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো।


উপসংহার

ক্ষুদিরাম বসু শুধুমাত্র একজন বিপ্লবী নন, তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়, যা প্রতিটি ভারতীয়ের মনে অনন্তকাল বেঁচে থাকবে।